নারীর শিকল: ধর্মের নামে বন্দি আমার স্বপ্ন

Umme Bibi Habiba

6/20/20261 min read

বইয়ের প্রথম পর্ব প্রকাশিত
:ইসলামের নামে এক হাফেজার ভাঙা স্বপ্ন"

হাফেজা হওয়ার দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিন ছিল। মাদরাসার বড় হলঘরটা সেদিন অদ্ভুতভাবে শান্ত, অথচ পবিত্র উত্তেজনায় ভরা। আতর আর গোলাপজলের গাঢ় সুবাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। লাল মলাটের কুরআন শরীফটা বুকে চেপে ধরে যখন আমি শেষ আয়াতটি তিলাওয়াত করলাম, মনে হলো—আমার ভেতরের সব আলো একসাথে জ্বলে উঠেছে। ওস্তাদজি এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর কণ্ঠে গর্ব আর স্নেহ মিশে ছিল।

“মাশাআল্লাহ, আজ থেকে তুমি হাফেজা।”

এই একটি বাক্য যেন আমার পুরো অস্তিত্বকে বদলে দিল। মনে হচ্ছিল, আমি শুধু ত্রিশ পারা মুখস্থ করিনি—আমি নিজের ভেতর একটা নতুন দরজা খুলে ফেলেছি। সেই দরজার ওপারে ছিল আলো, সম্ভাবনা, আর এক অদ্ভুত শক্তি।

বাড়ি ফেরার পথে ছায়াময় রাস্তাটা যেন আমার সাথে হাঁটছিল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছিল আমার মুখে। মনে হচ্ছিল, আল্লাহ যেন নিজ হাতে আমার কপালে আলো ছুঁইয়ে দিচ্ছেন। সেই আলোতে ভেসে আমার ভেতরে জন্ম নিল এক নতুন স্বপ্ন—একটা স্বপ্ন, যা এতদিন শুধু বুকের গভীরে লুকিয়ে ছিল।

আমি ভাবছিলাম, নারীরা যখন প্রসববেদনায় চিৎকার করে, যখন লজ্জায় কথা বলতে পারে না, যখন হাসপাতালে নারী ডাক্তার না থাকায় ভয় পায়—আমি হব তাদের পাশে দাঁড়ানো সেই মানুষটা। হযরত রুফাইদাহ (রা.)-এর গল্প আমার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ইসলামের প্রথম নারী চিকিৎসক—যিনি আহতদের সেবা করেছেন, নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমি ভাবছিলাম, যে ধর্ম নারীদের চিকিৎসার সম্মান দিয়েছে, সেই ধর্ম কি আমাকে থামাবে?

সেদিন মনে হয়েছিল, আমার স্বপ্নটা শুধু আমার না। এটা সেই সব নারীর স্বপ্ন, যারা নিরাপদ চিকিৎসা পায় না, যারা ব্যথায় কুঁকড়ে যায়, যারা লজ্জায় কথা বলতে পারে না। আমি তখন ঠিক করেছিলাম—আমি গাইনি ডাক্তার হব। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের ভবিষ্যৎকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে ফেলছি।

বাড়িতে ঢোকার সময় আমার মনে হয়েছিল—আজ সবাই খুশি হবে। আমি ভেবেছিলাম, তারা গর্বে চোখ ভিজিয়ে বলবে, “আমাদের মেয়ে হাফেজা হয়েছে… আর এখন ডাক্তার হবে!” আমি সত্যিই বিশ্বাস করেছিলাম, আমার স্বপ্ন তাদেরও আনন্দ দেবে।

কিন্তু আমি জানতাম না—আমার স্বপ্নটা তাদের কাছে অপরাধ। সেদিন সন্ধ্যায় ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে ছিল। আব্বা, বড় ভাই, আর কয়েকজন আত্মীয়। আমি খুব আস্তে, খুব লাজুকভাবে বললাম, “আব্বা… আমি গাইনি ডাক্তার হতে চাই।”

এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস বদলে গেল। যেন কেউ হঠাৎ করে সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। পরিচিত মুখগুলোতে অচেনা ছায়া নেমে এলো। আমি বুঝতে পারলাম—আমার স্বপ্নের আলোটা তারা দেখতে পায় না। তারা শুধু দেখে—একটা মেয়ে, যাকে ঘরের ভেতর আটকে রাখা উচিত।

ডাইনিং টেবিলে আমার বলা সেই ছোট্ট বাক্য— “আব্বা… আমি গাইনি ডাক্তার হতে চাই।”— ঘরের ভেতর যেন অদৃশ্য একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। আমি দেখলাম, আব্বার মুখের ভাঁজগুলো আরও গভীর হয়ে গেল, যেন তিনি এমন কিছু শুনেছেন যা তাঁর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে চলে যায়। আর বড় ভাই—যিনি এলাকার সার্টিফাইড মুফতি—তিনি প্রথমেই প্রতিক্রিয়া দিলেন।

তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারের পেছন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখে রাগ ছিল না, কিন্তু ছিল এক ধরনের কঠোরতা—যেন তিনি কোনো অপরাধীকে শাস্তি দিতে যাচ্ছেন। তার কণ্ঠস্বর ভারী, দৃঢ়, এবং এমনভাবে উচ্চারিত যে ঘরের অন্য কেউ সাহস পেল না শ্বাস নিতেও। “ডাক্তার হবি?”—তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন—“হাসপাতালে পুরুষ-মহিলা একসাথে থাকে। একজন মুসলিম মেয়ে সেখানে কাজ করবে? এটা কখনোই হতে পারে না।”

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, তিনি অন্তত আমার কথা শুনবেন। কিন্তু তিনি যেন আমার স্বপ্নের ওপর একটা মোটা দাগ টেনে দিলেন। তিনি আরও বললেন, “তুমি হাফেজা হয়েছ—এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তোমাকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, সেটা ঘরে বসেই রক্ষা করতে হবে। বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করা, সহশিক্ষায় যাওয়া, পুরুষদের সাথে মেলামেশা করা—এসব ইসলামে হারাম।” আমি খুব আস্তে বললাম, “কিন্তু ভাইয়া… আমি তো শুধু নারীদের চিকিৎসা করতে চাই। নারীদের জন্য নারী ডাক্তার থাকা জরুরি…” তিনি আমার কথা শেষ হতে দিলেন না। একটা হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমার যুক্তি দেওয়ার দরকার নেই। তুমি এখনো ছোট। তুমি জানো না বাইরে কী ফিতনা আছে। মেয়েদের আসল স্থান ঘর। এখানেই তোমার কাজ—কুরআন পড়া, আম্মাকে সাহায্য করা, আর বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া।” আমি অনুভব করলাম, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের ঘরেই অপরিচিত হয়ে গেছি। আব্বা তখন ধীরে ধীরে কথা বললেন। “মেয়েমানুষের বেশি পড়াশোনার দরকার নেই,” তিনি বললেন। “তুমি কুরআন মুখস্থ করেছ—এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। এখন ঘরে বসো, রান্নাবান্না শেখো। আমরা ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেব। স্বামীর সেবা করাই নারীর আসল দায়িত্ব।”

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার হাত কাঁপছিল। চোখের ভেতর পানি জমছিল, কিন্তু আমি কাঁদতে চাইনি। আমি শুধু ভাবছিলাম— কেন আমার স্বপ্নটা এত ভুল? কেন আমার ইচ্ছেটা এত অপরাধ? কেন আমার আলোটা তারা দেখতে পায় না? সেদিন রাতে আমি ঘরের কোণে বসে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার ভেতরের আলোটা কেউ নিভিয়ে দিয়েছে। যে আলো নিয়ে আমি বাড়ি ফিরেছিলাম— সেই আলোটা এখন শুধু ধোঁয়া হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।

এই নির্মম ভাগ্য শুধু আমার একার ছিল না। আমার মাদরাসার আরও অনেক মেধাবী বান্ধবী আর সহপাঠীর গল্পও ছিল ঠিক একই রকম। আমাদের হিফজ ক্লাসে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো ছাত্রী ছিল। আমরা সবাই একসাথে কুরআন মুখস্থ করতাম, হাসতাম, আর নিজেদের সুন্দর একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতাম। কিন্তু অত্যন্ত নির্মম সত্য হলো, হিফজ শেষ হতে না হতেই আমাদের এই ক্লাসের প্রায় প্রতিটি মেয়ের পড়াশোনার চাকা চিরদিনের জন্য থমকে গেল। সমাজ আর পরিবারের চাপ আমাদের পুরো ব্যাচটিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল। আমরা ২৫-৩০ জন মেধাবী মেয়ে, যারা পুরো কুরআন বুকে ধারণ করেছিলাম, আমাদের সবাইকে ঘরের কোণে বসিয়ে দেওয়া হলো।এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাতটি লেগেছিল আমার এক প্রিয় বান্ধবীর জীবনে। মেয়েটির বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। সে তখনো পুরো কুরআন মুখস্থ শেষ করতে পারেনি, হিফজের ঠিক মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিল। একদিন হঠাৎ করেই তার পরিবার তার পড়ালেখা বন্ধ করে দিল। ১৩ বছরের একটা অবুঝ শিশু, যার পুতুল খেলে আর কুরআন পড়ে দিন কাটানোর কথা, তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো একজন বয়স্ক পুরুষের সাথে।বিয়ের আগের দিন মাদরাসায় আমাদের জড়িয়ে ধরে তার সেই কান্নার শব্দ আমি আজও ভুলতে পারি না। সে কাঁদছিল আর বলছিল, "আমি তো আরও পড়তে চেয়েছিলাম, আমি হাফেজা হতে চেয়েছিলাম।" কিন্তু আমাদের সমাজের এই তথাকথিত ধার্মিক পুরুষদের হৃদয় সেই শিশুর ক্রন্দনে গলেনি। তারা একটি ১৩ বছরের মেয়ের শৈশব, তার হিফজের স্বপ্ন আর তার পুরো ভবিষ্যৎকে এক রাতে জীবন্ত কবর দিয়ে দিল। আর এই পুরো অপরাধটি করা হলো ইসলামের পবিত্র নামের আড়ালে, ধর্মের দোহাই দিয়ে।

আমরা যখনই আমাদের অধিকারের কথা বলতে চেয়েছি, এই সমাজ আমাদের মুখের ওপর ফতোয়ার দেয়াল তুলে দিয়েছে। আমরা একদল জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছিলাম, যাদের নিজস্ব কোনো ইচ্ছা, স্বপ্ন বা ভবিষ্যৎ বলতে কিচ্ছু ছিল না।

Connect

Join our community for updates and stories

Contact

Subscribe

hello@nursvara.com

+1-555-789-4321

© 2025. All rights reserved.