বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সম্মতির অধিকার
উম্মে বিবি হাবিবা
5/17/20241 min read


আসসালামু আলাইকুম প্রিয় দ্বীনি বোনেরা এবং ভাইয়েরা,
আজকে আমরা ইসলামের এমন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং জরুরি অধিকার নিয়ে আলোচনা করব, যা আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সেটি হলো—বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সম্মতির অধিকার।
আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের সম্মান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা বা বাবা-মায়ের জেদের কারণে একটি মেয়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। মেয়েটি কান্নাকাটি করলেও সমাজ তাকে বোঝায়, "বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে, বাবা-মায়ের অবাধ্য হতে নেই।
"কিন্তু আল্লাহর আইন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ এই বিষয়ে কী বলে? আসুন আজ পরিষ্কারভাবে, অকাট্য দলিলসহ সত্যটা জানি।
জোরপূর্বক বিয়ে ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম (Forbidden)
ইসলামে একটি বিয়ের মূল ভিত্তিই হলো 'ইজাব' ও 'কবুল'—অর্থাৎ এক পক্ষের প্রস্তাব এবং অপর পক্ষের তা সানন্দে গ্রহণ করা। এখানে জোর-জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। জোর করে বা ব্ল্যাকমেইল করে মুখে 'কবুল' বলালেই সেই বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ হয়ে যায় না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:
"হে ঈমানদারগণ! বলপ্রয়োগ করে নারীদেরকে উত্তরাধিকারে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য হালাল (বৈধ) নয়।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৯)
সহীহ বুখারীর স্পষ্ট দলিল
রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে নারীর এই অধিকারকে আইনিভাবে সুরক্ষিত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো নারীর কুমারী হোক বা বিধবা/তালাকপ্রাপ্তা—তার স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া তাকে বিয়ে দেওয়া যাবে না।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কোনো বিধবা বা বিবাহিতা নারীকে তার পরামর্শ (ও সম্মতি) ব্যতীত বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কোনো কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কুমারী মেয়ের অনুমতি কেমন করে জানা যাবে? তিনি বললেন, "তার নীরবতা (অর্থাৎ সে যদি লজ্জায় চুপ থাকে বা দ্বিমত না করে)।
" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫১৩৬)
এই হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, মেয়ের অমত থাকলে সেই বিয়ে দেওয়ার অধিকার স্বয়ং বাবারও নেই।
অনিচ্ছার বিয়ে বাতিল করার ঐতিহাসিক প্রমাণ
ইসলাম শুধু নিয়মই বানায়নি, বরং কেউ এই নিয়ম ভাঙলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থাও রেখেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে যখনই কোনো মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিনি সেই বিয়ে সরাসরি বাতিল (Invalid) ঘোষণা করেছেন।
ঘটনা ১:
হযরত খানসা বিনতে খিযাম (রা.) নামক এক আনসারী সাহাবী নারীর বিয়ে তাঁর বাবা তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক ব্যক্তির সাথে দিয়ে দিয়েছিলেন। এই নারী তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে বিচার চাইলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তৎক্ষণাৎ বাবার দেওয়া সেই বিয়েটিকে বাতিল ও অকার্যকর করে দিলেন এবং মেয়েটিকে নিজের পছন্দমতো বিয়ে করার অধিকার ফিরিয়ে দিলেন।
(সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫১৩৮)
ঘটনা 2:
সুনান ইবনে মাজাহ-র অন্য একটি হাদিসে এসেছে, এক তরুণী মেয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে কমপ্লেইন করলেন যে, তাঁর বাবা তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য ভাইয়ের ছেলের সাথে তার বিয়ে দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি সম্পূর্ণ মেয়েটির ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলেন (অর্থাৎ সে চাইলে বিয়ে রাখতে পারে, না চাইলে ভেঙে দিতে পারে)।
তখন সেই মেয়েটি একটি ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন: "হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা যা করেছেন তা আমি মেনে নিলাম। কিন্তু আমি এটি করতে চেয়েছিলাম যাতে পৃথিবীর সমস্ত নারীরা জানতে পারে যে—বিয়ের ব্যাপারে তাদের বাবাদের কোনো একক বা জোরপূর্বক অধিকার নেই।" (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১৮৭৪)
উপরের দলিলগুলো পড়ার পর কি আর কোনো সন্দেহ থাকে?
ইসলাম নারীকে তার জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার বা ফিরিয়ে দেওয়ার যে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিয়েছে, আমাদের সমাজ তথাকথিত 'লোকচক্ষুর ভয়' আর 'পারিবারিক সম্মানের' নামে তা কেড়ে নিচ্ছে।
মনে রাখবেন:
*মেয়ের সম্মতি ছাড়া জোর করে বিয়ে দেওয়া একটি বড় জুলুম (অন্যায়)।
*জোরপূর্বক বিয়ের মাধ্যমে গঠিত পরিবারে কখনো আল্লাহর রহমত বা বারাকাহ নেমে আসে না।
*বাবা-মায়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ফরজ, তবে দ্বীনের স্পষ্ট নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের জীবন ধ্বংস করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
আসুন, আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং আমাদের বোনদেরকে তাদের এই শরীআত-সম্মত অধিকার থেকে বঞ্চিত না করি। সংস্কৃতি বা লোকলজ্জার চেয়ে আল্লাহর দেওয়া আইন অনেক বড়